চালক হাফিজুর রহমান তার সিএনজি অটোরিকশায় বানজাশুরা রোডে সাবধানে যাচ্ছিলেন। কোথাও গোড়ালির গভীর পানি দেখে সে ভাবল যে কোনোভাবে পার হতে পারে। কিন্তু কিছুদূর যেতেই তার গাড়িটি পানির নিচে লুকানো একটি বড় গর্তে আটকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। অবশেষে প্রতিবন্ধী গাড়িটিকে পানিতে ঠেলে গন্তব্যের দিকে যেতে দেখা যায় তাকে।
গত বুধবার সকালে চট্টগ্রাম নগরীর অনন্যা আবাসিক এলাকার অক্সিজেন-কুইশ সড়কে এ দৃশ্য দেখা যায়। হাফিজুরের মতো আরও অনেকে ভাঙা রাস্তা ও জমে থাকা পানির কারণে ওই এলাকায় যানবাহন নিয়ে একই সমস্যায় পড়েছেন। হাফিজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুই-তিন দিন বৃষ্টি না হলেও রাস্তা পানিতে তলিয়ে আছে। বোঝার উপায় নেই কোথায় গর্ত। গাড়ির ইঞ্জিন দুবার বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় নয়, মনে হচ্ছে গাড়ি ঠেলে বিলে নিয়ে যাচ্ছি।
প্রায় এক দশক আগে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নির্মিত অক্সিজেন-কুইচ সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। সড়কে এখন বড় বড় গর্ত। টানা বৃষ্টিতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে গর্ত দেখা দেয়নি। ফলে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
উদ্বোধনের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো সড়কটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিএইচসিআইসি) কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নবায়ন ও তদারকির অভাবে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয় এবং কার্পেট সরে যায়। বর্ষাকালে এসব গর্ত পানির নিচে চলে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
2005 সালে, সিডিএ শহরের চান্দগাঁও ও কোচ এলাকায় 169 একর জমিতে অনন্যা আবাসিক এলাকা প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসাবে, প্রায় 45 কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় 5 কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের অক্সিজেন-কুয়েশ সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ কাজ 2013 সালে শুরু হয় এবং ডিসেম্বর 2015 এ শেষ হয়। তারপরে জানুয়ারী 2016 এ রাস্তাটি আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
উদ্বোধনের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো সড়কটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিএইচসিআইসি) কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও তদারকির অভাবে সড়কটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায়।
গত এক দশকে রাস্তার দুই পাশে দ্রুত নগরায়ন হয়েছে। একটি বেসরকারি হাসপাতাল, একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ 10টিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। শুধু অনন্যা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাই নয়, রাঙামাটির হাটহাজারী, রাউজিন ও কাপ্তাইয়ের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করে। তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও সড়কের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি।
সারা রাস্তা জুড়ে গর্ত, বৃষ্টিতে ভোগান্তি
কোথাও ছোট-বড় গর্ত, কোথাও উঁচু পিচ- এই অক্সিজেন-কোয়াইশ সড়কের পাঁচ কিলোমিটারের দৃশ্য। পাকসুনগর, গেদিয়া মোড়, তামান্না ব্লক এলাকা এবং অনন্যা আবাসিক এলাকা সহ অন্তত ছয়টি জায়গায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কে প্রায় প্রতিটি যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। মোটরসাইকেল চালকরা পায়ে ভারসাম্য বজায় রাখে। গর্ত এড়াতে অটোরিকশা ও রিকশা এদিক ওদিক চলাচল করে। কেউ কেউ পানির গভীরতা মাপতে আপনার সামনের গাড়ির পথ অনুসরণ করে। কখনও কখনও একটি গাড়ি খাদে পড়ে হঠাৎ দুলতে শুরু করে, অন্য একটি গাড়ি ভেঙে গিয়ে থেমে যায়। অনন্যা আবাসিক এলাকায় প্রবেশের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট রাস্তা গোড়ালি পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। ওই পানির নিচে কোথায় গর্ত, কোথায় সমতল রাস্তা তা জানার উপায় নেই।
পথচারী, যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, বৃষ্টি হলেই সড়কে দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পানির নিচে গর্ত দেখা যায় না বলে প্রায়ই মোটরসাইকেল চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সিএনজিতে চলাচলকারী অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের চাকা, সাসপেনশন ও ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। অনেক চালক বিকল্প রুট ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, এতে তাদের অনেক অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।
ওয়াজদিয়া মোড় এলাকার দোকানদার মুহাম্মাদ লিটাউন বলেন, সকালে স্কুলে যাওয়া শিশু এবং অফিসে যাওয়া লোকজনের বেশি কষ্ট হয়। বৃষ্টি হলে বের হওয়ার আগে ভাবতে হবে, কারণ আজ আবার গাড়ি আটকে যাবে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল পানির নিচের গর্ত। কখন চাকা পড়ে যায় বোঝা যায় না।
দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা
দীর্ঘদিন ধরে সড়ক স্থানান্তর নিয়ে সিডিএ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সড়কের দায়িত্ব নিতে সিডিএ দুটি চিঠি দিলেও চসিক তা গ্রহণ করেনি। সিটি করপোরেশনের দাবি, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার আগে এটিকে পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় দেখাতে হবে। সড়কের বর্তমান অবস্থায় দায়িত্ব নিলে নতুন সড়ক নির্মাণে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হতো।
অনন্যা আবাসন প্রকল্পে মোট 1000 প্লট জমি রয়েছে। এ অর্থ থেকে প্রায় দেড় হাজার প্লট জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও আবাসন এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এর অন্যতম কারণ দুর্বল যাতায়াত ব্যবস্থা।
সড়ক পরিবহন সমস্যা সমাধানে দুই সংগঠনের পাঁচ সদস্যের যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। কমিটি গত জানুয়ারিতে তাদের সুপারিশ পেশ করে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় সড়কটি পুনঃনির্মাণ করে সরবরাহ করার কথা বলা হয়। কমিউনিটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তা করতে না পারলে পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সিটি করপোরেশনকে দিতে হবে।
জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে চলমান রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ব্যাহত হয়েছে। কাজ শেষ হলে সড়কটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি বলেন, যে সংগঠনই কাজ করুক না কেন, এই মহাসড়কটির নবায়ন দ্রুত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
